বুধবার, মার্চ ২২, ২০১৭

পুরুষ যে নির্যাতিত, সেও পুরুষতন্ত্রেরই ফাঁদ



লিখেছেন : কাবেরী গায়েন

বেশ কিছু বছর থেকেই শুনছি, নারীদের আলাদা দিবস কেনো লাগবে? পুরুষরাও নির্যাতিত, পুরুষদের দিবস নেই কেনো? লেখা বাহুল্য, এসব কথা নারীদিবসকে ঘিরেই বেশি শোনা যায় এসব কথা একদল মানুষ ঠাট্টা করে বলেন, আরেকদল মানুষ এই ঠাট্টাকে আক্রমণ ভেবে উড়িয়ে দেন বিশেষ করে বেশিরভাগ নারীই মনে করেন পুরুষরা নির্যাতিত হন না আসলেই কি তাই? পুরুষরা কি নির্যাতিত হন না? বাহ্যিকভাবে হয়তো পুরুষদের নির্যাতন চোখে পড়ে না কিন্তু একটু নির্মোহ হতে পারলেই দেখবো, পুরুষতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাতা ফাঁদে পুরুষ ভয়াবহভাবে নির্যাতিত আফসোস, সেই নির্যাতন নিয়ে কথা বলার অধিকারও সে রাখে না অনেক ক্ষেত্রেই সে বোঝেও না
পুরুষ জন্ম থেকেই নির্যাতিত আমি জেনে-বুঝে এই মন্তব্য করছি। পার্থক্য শুধু এই যে তার নির্যাতনের স্বীকৃতি সমাজ-সংসার, এমনকি তার নিজের কাছেও নেই। তার নির্যাতনের ফাঁদকেই সে পৌরুষত্ব জেনে বড় হয়। পুরুষের জন্ম হয় বংশের বাতি দেবার জন্য, অর্থাৎ তার জন্ম হয়ই কিছু দায়িত্ব পালনের জন্য। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণীভেদে তাকে তৈরি হতে হয় শৈশব থেকে। অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়েকে সংসারের কাজ না করলেও চলে, অন্তত বিয়ের আগ পর্যন্ত। কিন্তু বর্গা চাষির ছেলেই হোক, কিংবা রাজপুত্রই হোক, বংশের বাতি জ্বালানোর জন্য তাকেউপযুক্তকরে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জন্মের পর থেকেই শুরু হয়। বর্গা চাষীর ছেলে হলে বাবার সাথে মাঠে যেতে হয়, গরু সামলাতে হয়, আর রাজপুত্র হলে অস্ত্রশিক্ষা, গুরুগৃহ- নানা কিছু শিখতে হয় শুধু না, একটা ছকে বাঁধা নিয়মে শিখতে হয়। উৎকর্ষ অর্জন করতে হয়। বাচ্চা ছেলে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলেও কাঁদা বারণ ছেলেরা আবার কাঁদে না কি? অতএব, ব্যথা পেয়ে ছেলে তুমি হাসো। ছেলে তুমি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হও, পাহাড়ে যাও, পড়াশুনায় শ্রেষ্ঠ হও। তুমি চাও বা না চাও। আর যদি খেলাধুলা ভালো না লাগে, তবে তো শৈশবেই ছাপ্পা পড়ে গেল চরিত্রে, ‘ম্যাদা মার্কা’, ‘মেনিমুখা ছেলে রবীন্দ্রনাথেরগিন্নীগল্পটা পড়া আছে নিশ্চয়ই। প্রাইমারির এক ছেলে বোনের সাথে নিজের বাসার দাওয়ায় বসে রান্নাবাটি খেলেছিলো বলে পন্ডিত মশায় ছেলেটিকে পরদিন ক্লাসে সবার সামনে কী নাস্তানাবুদই করেছিলেন! বংশের বাতি দেবার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য তাকে আবেগশূন্যভাবে তৈরি করা হয়। শরিকের বিবাদ, ব্যবসার চাতুরি, নির্দয়ভাবে ভালো ফলাফলের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে এক ছাঁচে ফেলা পুরুষ মানুষে রুপান্তরের কাজ চলে পুরুষতান্ত্রিক কারখানায়। আমার মনে আছে, আমার এক প্রাক্তন সহকর্মীর বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম তার ছোটভাই মনের সুখে চাকু দিয়ে কচি আম, লতাপাতা কেটে কুচি কুচি করে রান্নাবাটি খেলছে আর বাসার মা, বোন ভীষণ লজ্জিত ছেলে বা ভাইয়ের আচরণে। সারাক্ষণ তাকে এহেনো মেয়ে-সুলভ কাজের জন্য বকা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মা-বাবা মারা গেলেও ছেলের কান্না প্রত্যাশিত না, কারণ সেটা পুরুষসুলভ আচরণ নয়। ফলে, কোন ছেলের মধ্যে যদি আবেগের তোড় এসেও যায়, সে সেই আবেগ যেনো প্রকাশিত না হয়ে পড়ে সেই চাপ নিয়েই বড় হয়। আবেগের স্বাভাবিক প্রকাশ তাকে চেপে রাখতে হয়।

মঙ্গলবার, মার্চ ২১, ২০১৭

ইসলামের জিহাদ : বাস্তব এবং অবাস্তব



লিখেছেন : মোহাম্মদ মশিউর রহমান
জিহাদ সম্পর্কে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের সবারই ধারনা থাকা উচিৎ তাহলে অন্তত আমরা জিহাদে অংশগ্রহণ করি বা না করি অন্তত এই ব্যাপারটি দ্বারা আমরা আর কারও দ্বারা ভুল পথে অগ্রসর হব না আসুন আমার সীমিত জ্ঞ্যানে দেখি ইসলাম কি বলে এই সম্পর্কে আর আমাদের আমরা কি করছি এর নামে

আরবি শব্দজাহদাহথেকে জিহাদ শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ হল সংগ্রাম করা এর দ্বারা কোন দীনি যুদ্ধ বোঝায় না বরং এই দীনি যুদ্ধ বলতে আরবিতে যা বোঝায় তা হলহারবু মুকাদ্দাসা

কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখবেন কোরআন মাজিদের কোন স্থানেই হারবু মুকাদ্দাসা ব্যাবহার করা হয়নি কেননা সেগুলু দীনি যুদ্ধ ছিল না বরং ছিল আত্মরক্ষা, সমাজব্যবস্থা , অন্যায় , মিথ্যাচার এর বিরুদ্ধে উল্লেখ্য দীনি যুদ্ধ বলতে যা বোঝায় তা হল ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে করা যুদ্ধ বা হারবু মুকাদ্দাসা যা প্রথমবার করেছিল খ্রিস্টানরা এবং সেখানে বহু মানুষও হত্যাও করা হয়েছিল

যাই হোক এটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট যে আমরা শব্দটির ব্যাখ্যা অর্থ ভুল করি এবং কিভাবে এই জিহাদের অর্থ বিকৃত করে আমাদেরকে বোঝান হয় এবার আসুন দেখি কিভাবে এটির ভুল ব্যাবহার হয় আমাদের মত দেশগুলিতে

সোমবার, মার্চ ২০, ২০১৭

বাংলা ভাষার বিকাশ ও তার বিশ্বায়ন

লিখেছেন : দীপিকা ঘোষ
বাঙালি জাতির উৎপত্তির মতো তার ভাষার বিকাশ লাভও জটিল আর মিশ্রিত। এই দুয়ের আদিম পরিচয় শনাক্ত করতে তাই সোশ্যাল এনথ্রোপোলজিস্ট আর ভাষাবিদেরা বিচার-বিশ্লেষণের জন্য পেছনে ফিরে গিয়েছেন খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর অবধি। যখন ভারতবর্ষজুড়ে বৈদিক আর্যদের আগমন সাংস্কৃতিক প্রভাব সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। যখন তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বসবাস রয়েছে দ্রাবিড়, তিব্বতীয়-বার্মণ অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর।
যাই হোক, বাংলা বা বেঙ্গল শব্দের অরিজিন সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও পণ্ডিতদের অভিমত ১০০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে ভারতের পূর্বাঞ্চলজুড়েবাংনামের যে দ্রাবিড় ভাষাভাষী ট্রাইবদের বসবাস ছিলবাংলাশব্দের উৎপত্তি তার থেকেই হয়েছে। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা ভাষার আদিমতম নিদর্শন হিসেবে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকদের যোগসাধনার গুহ্য বিষয় নিয়ে রচিত চর্যাগীতিকাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। সুরসহযোগে এই গীতিকাগুলো গীত হতো সাধকদের সাধন-ভজনের জন্য। এর বয়স আনুমানিক ১০০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
সাহিত্যমূল্য সমন্বিত চর্যাগীতির এই অসাধারণ রচনাগুলো বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন মাত্র। যখন সবেমাত্র অন্যান্য ভাষা থেকে এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে সে জন্মলাভ করতে শুরু করেছে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে আধুনিক বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে বহু ভাষার দ্বারস্থ হতে হতেই সম্পূর্ণতা পেয়েছে। এর পরিপূর্ণ পরিশীলিত রূপায়ণ ঘটেছে ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে বেঙ্গল রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, প্যারীচাঁদ মিত্র, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং সবশেষে কবি রবীন্দ্রনাথ নজরুল ইসলামের হাত ধরে।
বাংলা শব্দ বিশ্লেষণ করে ভাষাবিদেরা প্রমাণ করেছেন, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় আরও অনেক ভাষার মতো (যেমন আসামিজ, ওড়িয়া, ভোজপুরি, মৈথালি, মাঘী প্রভৃতি) মাগধী প্রাকৃতই বাংলা ভাষার জননী। মাগধী প্রাকৃতকে কেউ কেউ অর্ধমাগধী বলেও আখ্যায়িত করেছেন। প্রাচীন ভারতে এই ভাষার জন্মলাভ সংস্কৃত পালির ব্যবহার ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার মূহূর্ত থেকে। মাগধী প্রাকৃত সংস্কৃত পালি ভাষার অপভ্রংশ রূপের সংমিশ্রণে তৈরি। প্রচলিত বিশ্বাস, বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক বুদ্ধ গৌতম এই ভাষাতেই কথা বলতেন। বৌদ্ধ সম্রাট মহামতি অশোক অর্ধ মাগধীকে সরকারি রাজভাষার মর্যাদা দান করায় এর প্রসার ক্রমে পূর্বাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন বাংলার আমজনতা অবশ্য সেকালে মাগধী প্রাকৃতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের জন্য নিজস্বতম ভাষা ছিল। যার ওপর প্রভাব ফেলেছিল অনার্য দ্রাবিড় ভাষাভাষী গোষ্ঠীসহ, আদি অস্ট্রোএশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো। বাংলা ভাষার জননী তাই অর্ধ মাগধী হলেও বাঙালির মাতৃভাষা মিশ্রিত ভাষা হওয়ার কারণে অন্যান্য অনেক ভাষার কাছেই ঐতিহাসিকভাবে ঋণী। মধ্যযুগের শাক্ত, বৈষ্ণব রোমান্টিক সাহিত্যের বাংলা ভাষা সম্বন্ধেও একই কথা সত্য। তবে আধুনিক যুগে মানবতন্ত্রের জীবনমুখী সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবে বাঙালির মাতৃভাষার পর্যাপ্ত ঋণ ক্ল্যাসিক সংস্কৃত শব্দের কাছে। কারণ, ঊনবিংশ শতকের বাংলার নব জাগরণের ফলে বিভিন্ন সুসাহিত্যিক চিন্তাবিদদের অবদানে বাংলা ভাষা যে রাজকীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল, তার প্রধান বাহন ছিল ক্ল্যাসিক সংস্কৃত শব্দ।