লিখেছেন : কাবেরী গায়েন
বেশ কিছু
বছর থেকেই
শুনছি, নারীদের
আলাদা দিবস
কেনো লাগবে?
পুরুষরাও নির্যাতিত,
পুরুষদের দিবস
নেই কেনো?
লেখা বাহুল্য,
এসব কথা
নারীদিবসকে ঘিরেই বেশি শোনা যায়। এসব
কথা একদল
মানুষ ঠাট্টা
করে বলেন,
আরেকদল মানুষ
এই ঠাট্টাকে
আক্রমণ ভেবে
উড়িয়ে দেন। বিশেষ
করে বেশিরভাগ
নারীই মনে
করেন পুরুষরা
নির্যাতিত হন না। আসলেই
কি তাই?
পুরুষরা কি
নির্যাতিত হন না? বাহ্যিকভাবে হয়তো
পুরুষদের নির্যাতন
চোখে পড়ে
না।
কিন্তু একটু
নির্মোহ হতে
পারলেই দেখবো,
পুরুষতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাতা ফাঁদে
পুরুষ ভয়াবহভাবে
নির্যাতিত।
আফসোস, সেই
নির্যাতন নিয়ে
কথা বলার
অধিকারও সে
রাখে না। অনেক
ক্ষেত্রেই সে বোঝেও না।
পুরুষ জন্ম
থেকেই নির্যাতিত। আমি
জেনে-বুঝে
এই মন্তব্য
করছি। পার্থক্য
শুধু এই
যে তার
নির্যাতনের স্বীকৃতি সমাজ-সংসার, এমনকি
তার নিজের
কাছেও নেই।
তার নির্যাতনের
ফাঁদকেই সে
পৌরুষত্ব জেনে
বড় হয়।
পুরুষের জন্ম
হয় বংশের
বাতি দেবার
জন্য, অর্থাৎ
তার জন্ম
হয়ই কিছু
দায়িত্ব পালনের
জন্য। সেই
দায়িত্ব পালনের
জন্য জাতি,
ধর্ম, বর্ণ,
শ্রেণীভেদে তাকে তৈরি হতে হয়
শৈশব থেকে।
অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়েকে সংসারের কাজ
না করলেও
চলে, অন্তত
বিয়ের আগ
পর্যন্ত। কিন্তু
বর্গা চাষির
ছেলেই হোক,
কিংবা রাজপুত্রই
হোক, বংশের
বাতি জ্বালানোর
জন্য তাকে
‘উপযুক্ত’ করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া
জন্মের পর
থেকেই শুরু
হয়। বর্গা
চাষীর ছেলে
হলে বাবার
সাথে মাঠে
যেতে হয়,
গরু সামলাতে
হয়, আর
রাজপুত্র হলে
অস্ত্রশিক্ষা, গুরুগৃহ- নানা কিছু শিখতে
হয় শুধু
না, একটা
ছকে বাঁধা
নিয়মে শিখতে
হয়। উৎকর্ষ
অর্জন করতে
হয়। বাচ্চা
ছেলে পড়ে
গিয়ে ব্যথা
পেলেও কাঁদা
বারণ।
ছেলেরা আবার
কাঁদে না
কি? অতএব,
ব্যথা পেয়ে
ছেলে তুমি
হাসো। ছেলে
তুমি খেলায়
চ্যাম্পিয়ন হও, পাহাড়ে যাও, পড়াশুনায়
শ্রেষ্ঠ হও।
তুমি চাও
বা না
চাও। আর
যদি খেলাধুলা
ভালো না
লাগে, তবে
তো শৈশবেই
ছাপ্পা পড়ে
গেল চরিত্রে,
‘ম্যাদা মার্কা’,
‘মেনিমুখা ছেলে’। রবীন্দ্রনাথের ‘গিন্নী’
গল্পটা পড়া
আছে নিশ্চয়ই।
প্রাইমারির এক ছেলে বোনের সাথে
নিজের বাসার
দাওয়ায় বসে
রান্নাবাটি খেলেছিলো বলে পন্ডিত মশায়
ছেলেটিকে পরদিন
ক্লাসে সবার
সামনে কী
নাস্তানাবুদই করেছিলেন! বংশের বাতি দেবার
উপযুক্ত করে
গড়ে তোলার
জন্য তাকে
আবেগশূন্যভাবে তৈরি করা হয়। শরিকের
বিবাদ, ব্যবসার
চাতুরি, নির্দয়ভাবে
ভালো ফলাফলের
প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে এক ছাঁচে
ফেলা পুরুষ
মানুষে রুপান্তরের
কাজ চলে
পুরুষতান্ত্রিক কারখানায়। আমার মনে আছে,
আমার এক
প্রাক্তন সহকর্মীর
বাড়িতে গিয়ে
দেখেছিলাম তার ছোটভাই মনের সুখে
চাকু দিয়ে
কচি আম,
লতাপাতা কেটে
কুচি কুচি
করে রান্নাবাটি
খেলছে আর
বাসার মা,
বোন ভীষণ
লজ্জিত ছেলে
বা ভাইয়ের
আচরণে। সারাক্ষণ
তাকে এহেনো
মেয়ে-সুলভ
কাজের জন্য
বকা দেওয়া
হচ্ছে। এমনকি
মা-বাবা
মারা গেলেও
ছেলের কান্না
প্রত্যাশিত না, কারণ সেটা পুরুষসুলভ
আচরণ নয়।
ফলে, কোন
ছেলের মধ্যে
যদি আবেগের
তোড় এসেও
যায়, সে
সেই আবেগ
যেনো প্রকাশিত
না হয়ে
পড়ে সেই
চাপ নিয়েই
বড় হয়।
আবেগের স্বাভাবিক
প্রকাশ তাকে
চেপে রাখতে
হয়।


