লিখেছেন : অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোটোবেলায়,
মানে আশির দশকের শেষ ভাগে এক ধরনের দেয়াল ক্যালেন্ডার বিক্রি হত দেখতাম। আমাদের বাড়িতেও
একটা ছিল। ক্যালেন্ডারটির ঠিক মাঝখান ছিল সিংহাসনে উপবিষ্ট ঘন নীল রঙের যমরাজ এবং সিংহাসনের
নীচে চিত্রগুপ্ত, যিনি বিশাল সাইজের একটা খাতা খুলে বসে দেখে নিচ্ছেন কোন্ মানুষ কী
পাপ করেছে কী পুণ্য করেছে। সেই ক্যালেন্ডারে উপর, নীচ, ডান ও বামদিকে ছিল প্রায় চোদ্দটি
উলঙ্গ নরনারীর ছবি। তাঁদের জহ্লাদরা অপরাধভেদে নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিচ্ছেন। যেমন পরকীয়া
শাস্তি দুদিকে দাঁতবিশিষ্ট দাঁড় করানো করাতে দু-দিকে নর ও নারীর শরীরের মাঝবরাবর চিরে
দেওয়া হচ্ছে বা মিথ্যা কথা বলার অপরাধে বিশাল একটা সাঁড়াশি দিয়ে কারোর জিভ টেনে ছিঁড়ে
দেওয়া হচ্ছে বা চুরি করার অপরাধে কারোর ডান হাত দেওয়া হচ্ছে ভয়ংকর এক চাপাতি দিয়ে ইত্যাদি।
এইসব ক্যালেন্ডার এখন আর চোখে পড়ে না।
এখন
কথা হল, এই শাস্তিটা কোথায় হয় ? নরকে, আরবি ভাষায় ইসলামীদের কাছে যা দোজখ বা জাহান্নম।
নরকের ঠিকানা কী ? এই ঠিকানা কেউ জানে না। কোনো ধর্মগ্রন্থেও সেই ভয়াল ভয়ংকর ঠিকানার
সন্ধান পাওয়া যায় না। যেহেতু মানুষের মৃত্যুর পর পাপীরা
শাস্তি ভোগ করে, সেহেতু কোনো মানুষের পক্ষেই ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি। তবে হিন্দুশাস্ত্র
মতে নরক মৃত্যুদেবতা যমরাজেরই বাসস্থান। বলা হয়েছে এটি মহাবিশ্বের দক্ষিণে এবং পৃথিবীর নীচে
অবস্থিত। বিষ্ণু পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরক মহাবিশ্বের
নীচে অবস্থিত মহাজাগতিক সাগরের নীচে অবস্থিত। দেবীভাগবত
পুরাণে বলা হয়েছে যে, নরক মহাবিশ্বের দক্ষিণে, পৃথিবীর নিচে কিন্তু পাতালের উপরে অবস্থিত। ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে নরক পৃথিবীর নীচে। পাতালের
সাতটি স্তর এবং মহাবিশ্বের তল গর্ভোদক সাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত। এটি মহাবিশ্বের দক্ষিণে
অবস্থিত। পিতৃলোক, যেখানে অগ্নিকুভের নেতৃত্বে মৃত পূর্বপুরুষ
(পিতৃগণ) বাস করে, এই অঞ্চলে অবস্থিত। নরকরাজ যম তাঁর সহকারীদের সঙ্গে বসবাস করেন। বিভিন্ন হিন্দু মহাকাব্যও একমত যে, নরক দক্ষিণদিকে অবস্থিত।
পিতৃলোককে যমের রাজধানী হিসাবে ভাবা হয়েছে।
মানুষের
মৃত্যুর পর যমদূত নামক যমরাজের দূতেরা তাঁদেরকে যমরাজের রাজসভায় নিয়ে আসে। যেখানে
তাদের পাপ-পুণ্যের হিসাব করা হয় এবং দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। পুণ্যবানদের স্বর্গে এবং
পাপীদের যে-কোনো একটি নরকে পাঠানো হয়, যেখানে যম তাঁর ন্যায়বিচার প্রদান করেন।
নরক হল জনৈক অসুর। পৌরাণিক কাহিনিতে নরকাসুর নামে অভিহিত হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মের একাধিক ধর্মগ্রন্থ। তাই বিভিন্ন গ্রন্থে
বিভিন্ন নামের ও সংখ্যার পাশাপাশি কোন্ প্রকারের পাপীকে কোন্ নরকে পাঠানো হবে তার ভিন্নতা
লক্ষ করা যায়। অগ্নি পুরাণে মাত্র ৪ টি নরকের উল্লেখ আছে। মনুস্মৃতি ২১ প্রকার নরকের
উল্লেখ করে। তবে ভাগবত পুরাণ, দেবী- ভাগবত পুরাণ,
বিষ্ণু পুরাণ এবং গরুড় পুরাণ গ্রন্থগুলিতে ২৮ ধরনের ভয়ংকর নরকের কথা বলে। তাই এই
২৮ নরককেই মূল নরক হিসাবে গণ্য করা হয়। অপরাধভেদে নরকগুলোর নাম হল –



