প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৮

নরক-ভাবনা এবং বাস্তবতা

লিখেছেন : অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়


ছোটোবেলায়, মানে আশির দশকের শেষ ভাগে এক ধরনের দেয়াল ক্যালেন্ডার বিক্রি হত দেখতাম। আমাদের বাড়িতেও একটা ছিল। ক্যালেন্ডারটির ঠিক মাঝখান ছিল সিংহাসনে উপবিষ্ট ঘন নীল রঙের যমরাজ এবং সিংহাসনের নীচে চিত্রগুপ্ত, যিনি বিশাল সাইজের একটা খাতা খুলে বসে দেখে নিচ্ছেন কোন্ মানুষ কী পাপ করেছে কী পুণ্য করেছে। সেই ক্যালেন্ডারে উপর, নীচ, ডান ও বামদিকে ছিল প্রায় চোদ্দটি উলঙ্গ নরনারীর ছবি। তাঁদের জহ্লাদরা অপরাধভেদে নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিচ্ছেন। যেমন পরকীয়া শাস্তি দুদিকে দাঁতবিশিষ্ট দাঁড় করানো করাতে দু-দিকে নর ও নারীর শরীরের মাঝবরাবর চিরে দেওয়া হচ্ছে বা মিথ্যা কথা বলার অপরাধে বিশাল একটা সাঁড়াশি দিয়ে কারোর জিভ টেনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে বা চুরি করার অপরাধে কারোর ডান হাত দেওয়া হচ্ছে ভয়ংকর এক চাপাতি দিয়ে ইত্যাদি। এইসব ক্যালেন্ডার এখন আর চোখে পড়ে না। 
এখন কথা হল, এই শাস্তিটা কোথায় হয় ? নরকে, আরবি ভাষায় ইসলামীদের কাছে যা দোজখ বা জাহান্নম। নরকের ঠিকানা কী ? এই ঠিকানা কেউ জানে না। কোনো ধর্মগ্রন্থেও সেই ভয়াল ভয়ংকর ঠিকানার সন্ধান পাওয়া যায় না। যেহেতু মানুষের মৃত্যুর পর পাপীরা শাস্তি ভোগ করে, সেহেতু কোনো মানুষের পক্ষেই ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি। তবে হিন্দুশাস্ত্র মতে নরক মৃত্যুদেবতা যমরাজেরই বাসস্থান। বলা হয়েছে এটি মহাবিশ্বের দক্ষিণে এবং পৃথিবীর নীচে অবস্থিত।  বিষ্ণু পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরক মহাবিশ্বের নীচে অবস্থিত মহাজাগতিক সাগরের নীচে অবস্থিত। দেবীভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে যে, নরক মহাবিশ্বের দক্ষিণে, পৃথিবীর নিচে কিন্তু পাতালের উপরে অবস্থিত। ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে নরক পৃথিবীর নীচে। পাতালের সাতটি স্তর এবং মহাবিশ্বের তল গর্ভোদক সাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত। এটি মহাবিশ্বের দক্ষিণে অবস্থিত। পিতৃলোক, যেখানে অগ্নিকুভের নেতৃত্বে মৃত পূর্বপুরুষ (পিতৃগণ) বাস করে, এই অঞ্চলে অবস্থিত। নরকরাজ যম তাঁর সহকারীদের সঙ্গে বসবাস করেন। বিভিন্ন হিন্দু মহাকাব্যও একমত যে, নরক দক্ষিণদিকে অবস্থিত। পিতৃলোককে যমের রাজধানী হিসাবে ভাবা হয়েছে।
মানুষের মৃত্যুর পর যমদূত নামক যমরাজের দূতেরা তাঁদেরকে যমরাজের রাজসভায় নিয়ে আসে। যেখানে তাদের পাপ-পুণ্যের হিসাব করা হয় এবং দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। পুণ্যবানদের স্বর্গে এবং পাপীদের যে-কোনো একটি নরকে পাঠানো হয়, যেখানে যম তাঁর ন্যায়বিচার প্রদান করেন।
নরক হল জনৈক অসুরপৌরাণিক কাহিনিতে নরকাসুর নামে অভিহিত হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মের একাধিক ধর্মগ্রন্থ। তাই বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন নামের ও সংখ্যার পাশাপাশি কোন্ প্রকারের পাপীকে কোন্ নরকে পাঠানো হবে তার ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। অগ্নি পুরাণে মাত্র ৪ টি নরকের উল্লেখ আছে। মনুস্মৃতি ২১ প্রকার নরকের উল্লেখ করে। তবে ভাগবত পুরাণ, দেবী- ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ এবং গরুড় পুরাণ গ্রন্থগুলিতে ২৮ ধরনের ভয়ংকর নরকের কথা বলে। তাই এই ২৮ নরককেই মূল নরক হিসাবে গণ্য করা হয়। অপরাধভেদে নরকগুলোর নাম হল –

সোমবার, মার্চ ২৭, ২০১৭

প্রসঙ্গ যৌনতা : জিশুর প্রকৃত শিক্ষা ও অপপ্রচার (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন : ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
(আজ আলোচনা জিশুর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে সে মার্গে গমনের পূর্বে দুটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন প্রথমত, গত দুই পর্বে আপনাদের সামনে কিছু বিশ্লেষণ হাজির করেছি অনেকেরই হয়তো সেসব অজানা ছিল কিন্তু আজ থেকে আমরা প্রবেশ করব এক চূড়ান্ত বিতর্কিত অথচ ঐতিহাসিক জগতে মসীহাকে অপমান করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই যেমন নেই কোনো বিশ্বাসীকে আঘাত করার বাসনা ধর্মের জগদ্দল পাথরে চাপা পড়ে থাকা তথ্য তুলে ধরাই প্রবন্ধের একমাত্র লক্ষ্য)
রোমান চার্চ জন্মক্ষণ থেকেই অস্তিত্ব সংকটে ভুগেছে জিশুর রহস্যাবৃত জন্মকে নিয়ে প্রথমে আমরা দেখে নেব জনের সুসমাচারের একটি প্রসিদ্ধ বচন: Jesus said unto them, ...I proceed forth and came from God; neither came I of myself, but he sent me. (John 8:41-2)
এই রূপ বিভিন্ন বাণী চার্চ বারংবার উদ্ধৃত করেছে জিশুর ঐশ্বরিক জন্মকথার ভিত্তি রূপে কোনও মানব যখনই ভক্তদের অভিলাষে দেবত্বে উপনীত হন, তখনই তাঁর অযৌন জন্মবৃত্তান্তের গপ্প প্রচলনের প্রয়োজন পড়ে প্রয়োজন হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ করার বুদ্ধ, মহাবীর, চৈতন্য - সকলের ক্ষেত্রেই এই পথ অনুসৃত হয়েছে ক্যাথলিক চার্চও যে একই রাস্তায় হাঁটবে সেটাই স্বাভাবিক যেন মনে হয়, ঈশ্বর স্বমৈথুন করে তাঁর শুক্রাণু কোথাও জমা রাখতেন, যেমন রাখা হয় আধুনিক স্পার্মব্যাঙ্কে অতঃপর সেই শুক্রাণু এক অদৃশ্য ইথার তরঙ্গের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয় মেরী প্রভৃতি 'কুমারী মাতা' গর্ভে
যে কোনো শিক্ষিত মানুষই স্বীকার করবেন, মানুষের ক্ষেত্রে অযৌন জনন অসম্ভব আফিমের নেশায় আচ্ছন্নরা মানতেই পারেন যে জিশু শুধুমাত্র Y ক্রোমোজোম নিয়েই কাজ চালাতেন, X ক্রোমোজোমের কোনো প্রয়োজন পড়েনি তাঁর ঈশ্বরের প্রতিভূরা এরকম বিজ্ঞান অসম্মত কাজকর্ম হামেশাই করে থাকেন কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠ মন দাবী মানতে অক্ষম তাই খোঁজ জিশু নামক মানবে, প্রথম প্রাণস্পন্দন দানকারী শুক্রাণুর
NTতে আমরা জিশুর পালকপিতা হিসেবে পাই যোসেফের নাম যোসেফের পিতৃত্বের দাবী ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ম্যাথিউ জানিয়েছেন: This is how Jesus Christ came to be born. His mother Mary was betrothed to Joseph; but before they came to live together she was found to be with child through Holy Spirit. (Mat 1:18)
ম্যাথিউ এর এই বক্তব্যের অনুরণন জন 8:42 তে কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে, জন 8:41 ইহুদিরা জিশুকে বলেছিলেন: We be not born of fornication; we have one Father.

মঙ্গলবার, মার্চ ২১, ২০১৭

ইসলামের জিহাদ : বাস্তব এবং অবাস্তব



লিখেছেন : মোহাম্মদ মশিউর রহমান
জিহাদ সম্পর্কে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের সবারই ধারনা থাকা উচিৎ তাহলে অন্তত আমরা জিহাদে অংশগ্রহণ করি বা না করি অন্তত এই ব্যাপারটি দ্বারা আমরা আর কারও দ্বারা ভুল পথে অগ্রসর হব না আসুন আমার সীমিত জ্ঞ্যানে দেখি ইসলাম কি বলে এই সম্পর্কে আর আমাদের আমরা কি করছি এর নামে

আরবি শব্দজাহদাহথেকে জিহাদ শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ হল সংগ্রাম করা এর দ্বারা কোন দীনি যুদ্ধ বোঝায় না বরং এই দীনি যুদ্ধ বলতে আরবিতে যা বোঝায় তা হলহারবু মুকাদ্দাসা

কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখবেন কোরআন মাজিদের কোন স্থানেই হারবু মুকাদ্দাসা ব্যাবহার করা হয়নি কেননা সেগুলু দীনি যুদ্ধ ছিল না বরং ছিল আত্মরক্ষা, সমাজব্যবস্থা , অন্যায় , মিথ্যাচার এর বিরুদ্ধে উল্লেখ্য দীনি যুদ্ধ বলতে যা বোঝায় তা হল ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে করা যুদ্ধ বা হারবু মুকাদ্দাসা যা প্রথমবার করেছিল খ্রিস্টানরা এবং সেখানে বহু মানুষও হত্যাও করা হয়েছিল

যাই হোক এটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট যে আমরা শব্দটির ব্যাখ্যা অর্থ ভুল করি এবং কিভাবে এই জিহাদের অর্থ বিকৃত করে আমাদেরকে বোঝান হয় এবার আসুন দেখি কিভাবে এটির ভুল ব্যাবহার হয় আমাদের মত দেশগুলিতে

সোমবার, মার্চ ২০, ২০১৭

বাংলা ভাষার বিকাশ ও তার বিশ্বায়ন

লিখেছেন : দীপিকা ঘোষ
বাঙালি জাতির উৎপত্তির মতো তার ভাষার বিকাশ লাভও জটিল আর মিশ্রিত। এই দুয়ের আদিম পরিচয় শনাক্ত করতে তাই সোশ্যাল এনথ্রোপোলজিস্ট আর ভাষাবিদেরা বিচার-বিশ্লেষণের জন্য পেছনে ফিরে গিয়েছেন খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর অবধি। যখন ভারতবর্ষজুড়ে বৈদিক আর্যদের আগমন সাংস্কৃতিক প্রভাব সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। যখন তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বসবাস রয়েছে দ্রাবিড়, তিব্বতীয়-বার্মণ অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর।
যাই হোক, বাংলা বা বেঙ্গল শব্দের অরিজিন সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও পণ্ডিতদের অভিমত ১০০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে ভারতের পূর্বাঞ্চলজুড়েবাংনামের যে দ্রাবিড় ভাষাভাষী ট্রাইবদের বসবাস ছিলবাংলাশব্দের উৎপত্তি তার থেকেই হয়েছে। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা ভাষার আদিমতম নিদর্শন হিসেবে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকদের যোগসাধনার গুহ্য বিষয় নিয়ে রচিত চর্যাগীতিকাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। সুরসহযোগে এই গীতিকাগুলো গীত হতো সাধকদের সাধন-ভজনের জন্য। এর বয়স আনুমানিক ১০০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
সাহিত্যমূল্য সমন্বিত চর্যাগীতির এই অসাধারণ রচনাগুলো বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন মাত্র। যখন সবেমাত্র অন্যান্য ভাষা থেকে এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে সে জন্মলাভ করতে শুরু করেছে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে আধুনিক বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে বহু ভাষার দ্বারস্থ হতে হতেই সম্পূর্ণতা পেয়েছে। এর পরিপূর্ণ পরিশীলিত রূপায়ণ ঘটেছে ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে বেঙ্গল রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, প্যারীচাঁদ মিত্র, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং সবশেষে কবি রবীন্দ্রনাথ নজরুল ইসলামের হাত ধরে।
বাংলা শব্দ বিশ্লেষণ করে ভাষাবিদেরা প্রমাণ করেছেন, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় আরও অনেক ভাষার মতো (যেমন আসামিজ, ওড়িয়া, ভোজপুরি, মৈথালি, মাঘী প্রভৃতি) মাগধী প্রাকৃতই বাংলা ভাষার জননী। মাগধী প্রাকৃতকে কেউ কেউ অর্ধমাগধী বলেও আখ্যায়িত করেছেন। প্রাচীন ভারতে এই ভাষার জন্মলাভ সংস্কৃত পালির ব্যবহার ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার মূহূর্ত থেকে। মাগধী প্রাকৃত সংস্কৃত পালি ভাষার অপভ্রংশ রূপের সংমিশ্রণে তৈরি। প্রচলিত বিশ্বাস, বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক বুদ্ধ গৌতম এই ভাষাতেই কথা বলতেন। বৌদ্ধ সম্রাট মহামতি অশোক অর্ধ মাগধীকে সরকারি রাজভাষার মর্যাদা দান করায় এর প্রসার ক্রমে পূর্বাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন বাংলার আমজনতা অবশ্য সেকালে মাগধী প্রাকৃতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের জন্য নিজস্বতম ভাষা ছিল। যার ওপর প্রভাব ফেলেছিল অনার্য দ্রাবিড় ভাষাভাষী গোষ্ঠীসহ, আদি অস্ট্রোএশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো। বাংলা ভাষার জননী তাই অর্ধ মাগধী হলেও বাঙালির মাতৃভাষা মিশ্রিত ভাষা হওয়ার কারণে অন্যান্য অনেক ভাষার কাছেই ঐতিহাসিকভাবে ঋণী। মধ্যযুগের শাক্ত, বৈষ্ণব রোমান্টিক সাহিত্যের বাংলা ভাষা সম্বন্ধেও একই কথা সত্য। তবে আধুনিক যুগে মানবতন্ত্রের জীবনমুখী সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবে বাঙালির মাতৃভাষার পর্যাপ্ত ঋণ ক্ল্যাসিক সংস্কৃত শব্দের কাছে। কারণ, ঊনবিংশ শতকের বাংলার নব জাগরণের ফলে বিভিন্ন সুসাহিত্যিক চিন্তাবিদদের অবদানে বাংলা ভাষা যে রাজকীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল, তার প্রধান বাহন ছিল ক্ল্যাসিক সংস্কৃত শব্দ।